
বিশেষ প্রতিবেদক :
জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা ৭৮ বছরের এক প্রবীণ মানুষ, সড়ক দুর্ঘটনায় রক্তাক্ত শরীর নিয়ে কাতরাচ্ছেন হাসপাতালের বিছানায়। এই বয়সে এবং এমন মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসকের কাছে রোগীর পরিবার আশা করে একটু সহানুভূতি, একটু আশ্বাসের বাণী। কিন্তু সেই আশার সলতেটুকু এক নিমেষে নিভিয়ে দিল দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের অশালীন আচরণ ও চরম ঔদ্ধত্য।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডাঃ মোঃ আসাদুজ্জামানের (৩৭তম বিসিএস, স্বাস্থ্য) বিরুদ্ধে উঠেছে রোগীর স্বজনকে গালিগালাজ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং মারধরের উদ্দেশ্যে তেড়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগ।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, শ্যামনগরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত অবস্থায় বৃদ্ধ কাজী আবু বকরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দু পায়ে জখম, হাড়ে আঘাত, এক পায়ের পাতার উপরের মাংস কেটে বাদ দেয়া হয়েছে। রোগীর দরকার আরো নিবিড় পরিচর্যা।
গত রবিবার (৯ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে তাঁকে দেখতে যান তাঁর জামাতা শেখ আব্দুর রহমান। কিন্তু অবাক করার ব্যাপার কোন পরামর্শ ছাাড়াই রুগীকে অশোভন আচরণ করে বের করে দেয়া হচ্ছে হাসপাতাল থেকে। শারীরিক অবস্থার তোয়াক্কা না করে দ্রুত রিলিজ দিয়ে বিদায় করাই যেন ছিল চিকিৎসকের প্রধান লক্ষ্য। এ নিয়ে কথা বলতে গেলেই কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ডাঃ আসাদুজ্জামান।
হৃদয়বিদারক ও ক্ষোভ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী শেখ আব্দুর রহমান বলেন,
"আমার ৭৮ বছর বয়সী বৃদ্ধ শ্বশুর রক্তাত অবস্থায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। এই মানুষটির এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সান্ত্বনা আর চিকিৎসকের সহমর্মিতা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ডাক্তার আসাদুজ্জামানের ব্যবহারে সরকারি সেবা দেওয়ার ন্যূনতম মানসিকতা ছিল না। রোগীর পরিজনকে 'তুই' ডেকে কথা বলা, গালি দেওয়া বা চিকিৎসা না দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা—এগুলো স্বৈরাচারী মনোভাব ছাড়া আর কিছু নয়। চলছে আগস্ট মাস, স্বৈরাচার পতনের মাস। কিন্তু মানুষের মনের গহীনে যদি এমন স্বৈরাচারী মনোভাব লুকিয়ে থাকে, তবে তা দূর করবে কে?"
ঘটনার পর ভুক্তভোগী শেখ আব্দুর রহমান সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে হাসপাতাল পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ শেখ কুদরতি খোদা তদন্ত কমিটি গঠন ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ এখনো মেলেনি।
অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, নিজেকে 'শুদ্ধাচারী' প্রমাণ করতে ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন অভিযুক্ত চিকিৎসক আসাদুজ্জামান। নিজের দোষ ঢাকতে আত্মীয়তার সূত্র (শালা, খালু, দুলাভাই) ও প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে অলিখিত তদবিরের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।
প্লেটোর বিখ্যাত সংলাপে দার্শনিক সক্রেটিসের একটি চিরায়ত উক্তি স্মরণ করিয়ে দেয়:
"মানুষের যদি সাধন করার মতো মহৎ কাজ থাকে, তবে তার সামনে বড় প্রশ্ন জীবন কিংবা মৃত্যু নয়। তার বিবেচনার একমাত্র বিষয় হওয়া আবশ্যক—আপন কাজ সাধন করার জন্য সে কোথাও কোনো অন্যায় কিংবা অপকর্মের আশ্রয় গ্রহণ করল কিনা।"
কিন্তু একজন চিকিৎসকের মহৎ পেশায় থেকে যদি অন্যায়ের আশ্রয় নিয়ে রোগীকে লাঞ্ছিত করতে হয়, তবে চিকিৎসা ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিটাই ধসে পড়ে।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এমন 'আচরণগত দুর্ভিক্ষে' অতিষ্ঠ হয়ে অনেক সাধারণ ও অসহায় মানুষ বাধ্য হয়ে সুচিকিৎসার খোঁজে হাত বাড়াচ্ছেন ব্যয়বহুল বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালের দিকে। সরকারি চিকিৎসকদের এমন চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বজায় থাকলে সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল সরকারি হাসপাতালগুলো যে চরম কোণঠাসা হয়ে পড়বে, তা সুনিশ্চিত।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের সাথে সাথে 'চিকিৎসা' প্রতিটি নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার। এই অধিকার বাস্তবায়নে সরকার প্রতি বছর জনগণের করের কোটি কোটি টাকা খরচ করে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল পরিচালনা করছে।
একজন দেশের প্রবীণ নাগরিক (Senior Citizen), যিনি জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রাখেন, তাঁকে অবহেলা ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হওয়া সমগ্র চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
জনগণের করের টাকায় চালিত সেবা খাতে কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ঔদ্ধত্য বা স্বৈরাচারী মানসিকতা মেনে নেওয়া যায় না। সচেতন সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগী পরিবার অনতিবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোড় দাবি জানিয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: শেখ আরিফুজ্জামান রাজু
জিমেইল/ নিউজ/CV: dailykakshiyali@gmail.com
ঠিকানা: কালীগঞ্জ, সাতক্ষীরা ,মোবাইল : 01637-734684