
শিক্ষা ডেস্ক:
শেখ আরিফুজ্জামান রাজু
মানুষ সফলতা চায় আশায় আশায়, পাই ব্যর্থতার গ্লানি স্বাধীনতা পেয়েও উন্মাদ রয়, টানে পরাধীনতার ঘানি। তবে সব পরাধীনতাকে পরাভৃত আর পরাজিত করে সাতক্ষীরা জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের মাঝে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে এমনই ৬জন মেধাবী শিক্ষার্থী যারা ২০২৫ সালের এসএসসিতে সর্বোচ্চ নাম্বারের সাথে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে ১.সাফিয়া হুদা ২. স্তুতি বিশ্বাস ইমি ৩. তামান্না আহছানী ৪.আপন কুমার ঘোষ ৫.সুমন হোসেন ৬.শেখ মুনতহা শাফায়েত মম্মিত। তারা শুধু যে পরীক্ষায় ভালো ফল লাভ করেছে তা নয় তার একটি আদর্শ জীবন কাঠামোর মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। পরিবারের দৈনতা আর হাজারো অসামাজিক কার্যকলাপের ভিড়েও নিজেদের রেখেছে মাধুর্যপূর্ণ জীবন কাঠামোতে।
১. সাফিয়া হুদা: বইপ্রেমী সাফিয়া হুদা। এসএসসি ২০২৫ পরীক্ষায় সাতক্ষীরা জেলার সর্বোচ্চ নাম্বার প্রাপ্ত শিক্ষার্থী। অথচ আজও তার মোবাইল ব্যবহার করারও ইচ্ছেটুকু জাগেনি। পাঠ্য বইয়ের বাইরে নিজের একাকীত্ব ঘোচাতে বাবার কাছে আবদার করতো গল্প ও উপন্যাস পড়বে বলে। সাফিয়ার বাবা সহ. অধ্যাপক মো: নাজমুল হুুদা বলেন- সাফিয়া একটানা পড়তো, পড়ার কথা কখনো তাকে বলতে হয়নি। সে পাঠ্য বইয়ের প্রতি বেশি মনোযোগী ছিল। মন চাইলে ঘরের কোণে বসেও পড়তো। সাফিয়া ডাক্তার হতে চায়। ইংরেজি ভাষার প্রতি ও তার আগ্রহ অনেক। সাফিয়া জানাই আগ্রহভরে পড়লেই ভালো কিছু করা সম্ভব। এবং অবশ্যই একজন সফল মানুষকে অনুসরণ করা সাফল্যের নিকটবর্তী হওয়ার স্বরূপ। সাফিয়ার সফলতার গল্পে তার কুয়েটে পড়ুয়া ভাই শিহাবুল ইহসানের অনুপ্রেরণা বলে স্বীকার করে।
২. স্তুতি বিশ্বাস ইমি: ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই নেতৃত্বের গুনে গুণান্বিত কালিগঞ্জ পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের লাজুক, স্বল্পভাষী বিনয়ী ও দায়িত্বশীল শিক্ষার্থী স্তুতি বিশ্বাস ইমি সাতক্ষীরা জেলায় মেধা তালিকায় ২য়। তার কঠোর পরিশ্রম, পাঠের প্রতি একাগ্রতা এবং মা- বাবা ও শিক্ষকদের সঠিক দিকনির্দেশনা তাকে এই অনন্য সাফল্যে পৌঁছে দিয়েছে বলে ইমি মনে করে। শিক্ষকরা তার স্বর্ণালী সাফল্য কামনা করেন। তার জ্ঞান স্পৃহাকে পরিতৃপ্ত দেয়ার মত আরো গুণী ও দক্ষ শিক্ষক পেলে আরও ভালো ফল লাভ করতো বলে মনে করে তার পরিবার। ইমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়। ইমি মনে করে নিজের চেষ্টা ছাড়া কখনো কোন কাজে সফলতা অর্জন করা যায় না।
৩. তামান্না আহছানী: নলতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিত প্রেমী তামান্না আহছানী ডক্টর হয়ে মানব কল্যাণে এগিয়ে আসতে চাই। তার সফলতার পেছনে মা-বাবা এবং শিক্ষকদের অবদানকে স্বীকার করে। ৭ থেকে ৮ ঘন্টা পড়ুয়া তামান্না ভালোভাবে বুঝে পড়া, এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুশীলন করাকে সাফল্যের চাবিকাঠি মনে করে।
৪. আপন কুমার ঘোষ: ইংরেজি শিক্ষার প্রতি অনুরাগী আপন কুমার ঘোষ বড় হয়ে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার হতে চায়। আপন বলে – আমি আমার শিক্ষা জিবনে সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করেছি আর্থিক সমস্যা। কিন্তু কোনো সমস্যা আমার বাবা-মা কাউকে বুঝতে দেয় নি। আমরা জীবন থেকে শিক্ষা নিতে পারি। সফলতা অর্জন করতে অনেক বাধা পেরুতে হয়, তাই বলে হার মানা যাবে না। নতুন এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পরামর্শ- নিজের উপর বিশ্বাস রাখো এবং সঠিকভাবে পরিশ্রম করো, দেখবে জীবনে সফলতা অর্জন সুনিশ্চিত। বাবা-মা এবং দিদির কাছে আমি চিরদিন কৃতজ্ঞ। তাঁদের প্রচেষ্টা বৃথা যায়নি।
৫. শেখ মুনতহা শাফায়েত মম্মিত:শেখ মুনতহা শাফায়েত মম্মিত সফলতার গল্প ব্যক্ত করতে গিয়ে অব্যক্ত কান্নার দিনগুলোর কথা মনে করেন। নবম শ্রেণীতে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়েও পড়া হয়নি। হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার সময় বাবার মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে সময় লেগে যায়। বিজ্ঞান থেকে বাণিজ্য বিভাগ পরিবর্তন করে পড়াশোনায় মন না বাসাতে পারলেও মায়ের দুঃখ তাকে বাধ্য করে বইয়ের কাছে নিয়ে যেতে। টেস্ট পরীক্ষায় ভালো না হলেও পরবর্তীতে সর্বোচ্চ পরিশ্রম করে শীর্ষ স্থানীয় শিক্ষার্থীদের মর্যাদায় নিজেকে দাঁড় করায় আজ। দুর্বল শিক্ষার্থী থেকে হয়ে গেল দেশ সেরা শিক্ষার্থী। জিপিএ-৫ বা ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েই ক্ষান্ত হয়নি, আজ সে নটরডেম কলেজের একজন শিক্ষার্থী। মা, চাচারা এবং শিক্ষকরা যেভাবে তাকে প্রশান্তির পরশ দিয়েছিলো তা কখনো ভুলবার নয় বলতে বলতে কেঁদে ফেলে আজকের সফল শাফায়েত মম্মিত। স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে সাফায়েত বলে, এখন CA পড়তে চাই। দুঃখ থাকবে জীবনে, তবে আমাদের শিক্ষার্থীদের চলার পথটাও গুছিয়ে নিতে হবে। কারণ আজকে যারা আমাদের আনন্দের পাশে আছে, কালকে তারা নাও থাকতে পারে। চেষ্টা আর ইচ্ছে মানুষকে সর্বোচ্চ সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে উৎসাহ প্রদান করে।
৬. সুমন হোসেন: বাবা দিনমজুর, মা লেখাপড়ার কিছুই জানেনা। ভূমিহীন পরিবারের অসহায় জীবন। তবু অদম্য মনোবল সুমন হোসেনের। একদিন প্রশাসন বিসিএস ক্যাডার থেকে ডেপুটি কালেক্টর (ডিসি) হয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে। সুমনের মা বলেন – আমরাও ছেলের আশায় ভাবছি, এত অভাবের মধ্যেও ওর পড়া থেমে থাকে নি। এসএসসি পরীক্ষার পরেই সে কোথা থেকে বই জোগাড় করে বইয়ের প্রায় অর্ধেক শেষ করে ফেলেছে। তার মতো সন্তান পেয়ে আমরা গর্বিত। সুমন বলে- যে লক্ষ্য আমার পথের কাঁটা, আমি সে কাজের ধারে পাশেও যায় না। পরবর্তী এসএসসি পরীক্ষাথীদের পরামর্শ দিয়ে বলে- আগে লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ শুরু করতে হবে। যে কাজ লক্ষ্যকে ভ্রুষ্ট করে দেয়, যত শীঘ্রই সম্ভব সে কাজ থেকে এড়িয়ে চলে মূল লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হতে হবে, তবেই সফলতা আসবে সুনিশ্চিত। সুমন যশোর ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে পড়ার ইচ্ছা পোষণ করলেও পারিবারিক দৈন অবস্থাকে ভেবে সাধারণ কলেজে ভর্তি হয়েছে।
মেধাবীরা শুধু শেখেনা, সমাজকে শেখায়ও বটে। আর যদি সেই মেধাবির মাঝে থাকে পরিবর্তনের গুণ, তবে সমাজ তো বদলাবেই।
Leave a Reply