
শিমুল হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মো. গোলাম রউফ খান-এর কর্মজীবন ঘিরে একের পর এক বিতর্ক ও প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, পেশাগত সততা, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীল অবস্থান বজায় রাখার কারণেই বারবার প্রশাসনিক বৈষম্য ও চাপের মুখে পড়েছেন এই কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলনা জেলা-র পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি নিরপেক্ষতা বজায় রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের প্রাথমিক ধাপগুলোতে বিরোধী দল-সমর্থিত কয়েকজন প্রার্থীর জয়লাভের পরই প্রভাবশালী মহলে অস্বস্তি তৈরি হয়।
অভিযোগ রয়েছে,পরবর্তীতে তাকে ‘বিএনপি-জামায়াত ঘনিষ্ঠ’ তকমা দিয়ে হঠাৎ করেই শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। খুলনা থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ দিয়ে তাকে বরিশাল-এ পাঠানো হয়, যা অনেকেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আড়ালে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।পরবর্তীতে বরিশালে কর্মরত অবস্থায় তিনি বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (দক্ষিণ) হিসেবে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার বছর দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনকালে তিনি কঠোর, সৎ ও পেশাদার মনোভাবের পরিচয় দেন। তবে এখানেও তার নিরপেক্ষ অবস্থান অনেক মহলের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয় ২০১৮ সালের বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০১৮-কে ঘিরে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপি ঠেকাতে তিনি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। আর ঠিক সেই সময় থেকেই তাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ভোটের মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ২৪ জুলাই ২০১৮ তাকে হঠাৎ করেই বদলি করে ট্যুরিস্ট পুলিশে এসপি হিসেবে পাঠানো হয়।
এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের ঠিক আগে কেন সরিয়ে দেওয়া হলো? এটি কি শুধুই প্রশাসনিক রদবদল ছিল, নাকি এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর চাপ কাজ করেছে।সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, ডিআইজি গোলাম রউফ খানের বিরুদ্ধে কোনো সুস্পষ্ট পেশাগত ব্যর্থতা বা অনিয়মের অভিযোগ না থাকলেও বারবার বদলি ও পদায়নের মাধ্যমে তাকে চাপে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
এতে অনেকের মতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, প্রশাসনের ভেতরে সততা ও নিরপেক্ষতা অনেক সময় ‘অপরাধে’ পরিণত হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি যেখানেই দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। আর সেই জনআস্থাই হয়তো ক্ষমতাকেন্দ্রিক কিছু মহলের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তার প্রতি এমন আচরণ কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি প্রশাসনের ভেতরে বিদ্যমান গভীর অসুস্থ প্রবণতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা যদি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেও নিরাপদ না থাকেন, তবে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামো কতটা কার্যকরভাবে টিকে থাকবে?
Leave a Reply