
নিজস্ব প্রতিবেদক, কালিগঞ্জ,সাতক্ষীরা : সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা মহৎপুর গ্রামের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং আর্তমানবতার সেবায় এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করল মহৎপুর কল্যাণ সংস্থা। আজ ৮ মে ২০২৬, শুক্রবার বিকেলে মহৎপুর পাবলিক লাইব্রেরী মিলনায়তনে সংস্থার এক বর্ণাঢ্য এক যুগ মানবিক সহায়তা কর্মসূচির বিশেষ সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের সভাপতি ও সরকারের প্রাক্তন সচিব রফিকুল ইসলামের অনুপস্থিতির কারণে অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাধারণ সম্পাদক ও অবসরপ্রাপ্ত এএসপি আব্দুল্লাহ আল সাঈদ।
মানবিকতার এক দশক : সভাপতির বক্তব্যে আব্দুল্লাহ আল সাঈদ সংগঠনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও বর্তমান কর্মতৎপরতা তুলে ধরে বলেন, “২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মহৎপুর কল্যাণ সংস্থা নিরবচ্ছিন্নভাবে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছে। দীর্ঘ এক যুগের এই পথচলায় আমরা প্রতি বছর পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে দুস্থদের মাঝে ইফতার ও ঈদ সামগ্রী বিতরণ এবং সুষ্ঠুভাবে কোরবানির মাংস বিতরণ নিশ্চিত করে আসছি।”
তিনি আরও জানান, বর্তমান কার্যক্রমেও সংস্থা তার সেবার পরিধি বিস্তৃত করেছে। যার আওতায় আজ পর্যন্ত প্রায় ২০০ জন অসহায় ব্যক্তিকে সরাসরি আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে। জীবন ও জীবিকার পথ সুগম করতে ৬০ জন অসহায় ব্যক্তিকে দেওয়া হয়েছে ব্যাটারিচালিত ভ্যান। এছাড়া দুই জন গৃহহীনকে নতুন ঘর নির্মাণে সহায়তা এবং স্থানীয় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণের কর্মসূচিও তিনি তার বক্তব্যে সবিস্তারে তুলে ধরেন। গ্রাম উন্নয়নে শিক্ষকদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের গ্রামে ৬০-এর অধিক শিক্ষক বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছেন; তারাই পারেন মহৎপুরকে একটি আধুনিক ও উন্নত জনপদে রূপান্তর করতে।”
গুণীজনদের ভাবনায়: আগামীর মহৎপুর: অনুষ্ঠানে উপস্থিত সুধীবৃন্দ তাদের মূল্যবান মতামত ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেন-
প্রফেসর আব্দুল হান্নান : কালিগঞ্জ সরকারি কলেজের এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “শিক্ষার্থীরা এখন ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। তাদের সঠিক আলোর পথ দেখানোর গুরুদায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।”
প্রফেসর সৈয়দ মাহমুদুর রহমান : রোকেয়া মনসুর ডিগ্রী মহিলা কলেজের শিক্ষক গ্রাম উন্নয়নের তথ্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং শিক্ষার্থীদের পাঠে আগ্রহী করতে ‘পুরস্কার প্রথা’ চালুর প্রস্তাব দেন।
সহ.শিক্ষক খান জাহাঙ্গীর আলম: মোজাহার মেমোরিয়াল স্কুলের এই শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফেরানোর অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং গ্রামকে সুশোভিত করতে ‘বৃক্ষরোপণ অভিযান’কে অত্যন্ত কার্যকরী হিসেবে উল্লেখ করেন।
শেখ আরিফুজ্জামান রাজু: নবীন শিক্ষকদের পক্ষ থেকে তিনি লাইব্রেরীকে পাঠক সমাবেশ কেন্দ্রে রূপান্তরের আহ্বান জানান। তিনি প্রতি বছর সাতটি ক্যাটাগরিতে ‘শ্রেষ্ঠ বিজেতা’ নির্বাচন, লাইব্রেরীতে নিয়মিত বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা রাখা, তথ্য সংরক্ষণের জন্য কম্পিউটার এবং একটি নিয়মিত সাময়িকী প্রকাশের প্রস্তাব পেশ করেন।
আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে সুদূরপ্রসারী অঙ্গীকার: সভায় জানানো হয়, মহৎপুরকে একটি আদর্শ গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলতে মহৎপুর স্পোর্টস ক্লাব, মহৎপুর কল্যাণ সংস্থা এবং মহৎপুর পাবলিক লাইব্রেরী এখন থেকে একীভূত শক্তির ন্যায় কাজ করবে। তাদের অভিন্ন লক্ষ্য হলো— মহৎপুরকে একটি মাদকমুক্ত, অপরাধহীন এবং সুষ্ঠু বিনোদন নির্ভর যুব সম্প্রদায় উপহার দেওয়া।
অতিথিদের অভিমত: অনুষ্ঠানে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেও তারুণ্যের মতো উজ্জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব খান আহসানউল্লাহ। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, “আলোকিত সমাজ গড়তে লাইব্রেরীর কোন বিকল্প নেই। মহৎপুর কল্যাণ সংস্থা যেভাবে উন্নয়নমূলক কাজ করছে আমাদের সকলের উচিত এই কাজকে আরো বেগবান করা।”
এছাড়াও দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও হাজী তোফিল উদ্দিন মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সুপার শেখ সফিউল্লাহ মহৎপুর কল্যাণ সংস্থার কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করে নেকির কাজ ও সাদগায় জারিয়ার কাজ হিসেবে সকলকে এগিয়ে আসা উচিত এবং প্রয়োজনে প্রত্যেকের আর্থিক সম্পৃক্ততা থাকা উচিত বলে মতামত ব্যক্ত করেন।
অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সৈয়দ মিজানুর রহমান, ব্রাক ব্যাংকের প্রাক্তন SEO নাসরুল্যাহ খান এবং এলাকার অগণিত শিক্ষানুরাগী উপস্থিত থেকে তাদের মূল্যবান মতামত পেশ করেন। আলোচনায় আরও অংশ নেন আব্দুল্লাহ আল হাসান , শেখ আনিসুর রহমান, মাইমুনা পারভীন, শিরিনা সুলতানা , শেখ মিজানুর রশীদ, শেখ শফিকুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম, শহীদ মেহেদী, শেখ আব্দুল্লাহ আল শাকিল,আমিরুল ইসলাম প্রমুখ। বক্তারা মহৎপুর কল্যাণ সংস্থার এই মানবিক উদ্যোগকে ‘হৃদয়স্পর্শী’ আখ্যা দিয়ে গ্রামের সার্বিক সমৃদ্ধির জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার শপথ গ্রহণ করেন।
Leave a Reply